রাজনৈতিক দলগুলো যদি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে চায়, তবে তাদের নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। তবে এই নিবন্ধন পেতে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন দলগুলোর নিবন্ধনের শর্ত কিছুটা সহজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার পটভূমি
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয় এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে নতুন বিধান যুক্ত হয়। এই আইনের অধীনে কোনো দলকে নিবন্ধন পেতে হলে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা কার্যালয় এবং কমপক্ষে ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর কার্যালয় থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রতিটি কার্যালয়ে অন্তত ২০০ জন ভোটার নিবন্ধিত থাকাও শর্তের মধ্যে ছিল।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন বিদ্যমান কঠোর শর্তগুলো সহজ করার সুপারিশ করেছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী—
✅ নিবন্ধনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকতে হবে।
✅ অন্তত এক-দশমাংশ জেলায় কার্যকর জেলা কার্যালয় থাকতে হবে।
✅ মোট ৫ শতাংশ উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর কার্যালয় থাকা বাধ্যতামূলক হবে।
✅ দলের নিবন্ধনের জন্য অন্তত পাঁচ হাজার ভোটার তালিকাভুক্ত থাকতে হবে।
এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে, যেখানে বর্তমানে নিবন্ধনের জন্য অন্তত ২২টি জেলায় জেলা কার্যালয় এবং ১০০টি উপজেলায় অফিস থাকা দরকার, সেখানে নতুন নিয়মে মাত্র ৭টি জেলায় এবং ৬১টি উপজেলায় কার্যালয় থাকলেই নিবন্ধন পাওয়া সম্ভব হবে।
নিবন্ধনের অতিরিক্ত শর্ত ও বিতর্ক
নিবন্ধনের জন্য শুধুমাত্র কার্যালয় থাকলেই হবে না, বরং দলের গঠনতন্ত্রেও কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মানতে হবে। যেমন:
🔹 কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য কমিটির সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত করা।
🔹 দলের সকল সদস্য ও নির্বাচিত কমিটির তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা।
🔹 রাজনৈতিক দলের ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনসহ লেজুড়বৃত্তিক কোনো অঙ্গসংগঠন রাখা যাবে না।
🔹 মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুরুতর অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের দলের সদস্যপদ দেওয়া যাবে না।
নিবন্ধন নিয়ে বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ৯৩টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টিকে (বিএসপি) নিবন্ধন দেয়। ফলে বিদ্যমান কঠোর শর্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বর্তমান নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে কঠিন বলে মনে করে। কেউ কেউ এমনকি নিবন্ধন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাই শর্ত কিছুটা সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও বাস্তবসম্মত হয়।
এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে ছোট দলগুলোর জন্য নিবন্ধন পাওয়া সহজ হবে, তবে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
ট্যাগ: #নির্বাচন_সংস্কার #রাজনৈতিক_দল #নতুন_নীতি #নির্বাচন_কমিশন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন